গীতার ২য় অধ্যায় কর্মযোগ(শ্লোক:5-6)

গীতার ২য় অধ্যায় কর্মযোগ(শ্লোক:5-6)

গুরুনহত্বা হি মহানুভাবান্ শ্ৰেয়ো ভোজুং ভৈক্ষ্যমপীহ লোকে।

হত্বার্থকামাংস্তু গুরুনিহৈৰ তৃপ্তীয় ভোগান্ রুধিরপ্রদিগ্ধান্ ॥ ৫॥

-অবশ্যই; মহানুভাবান্ -গুরুজনেরা; অহত্ত্বা -হত্যা না করে, হি – মহান আত্মাগণ; শেষ– – শ্রেয়; ভোকুম্ – ভোগ করা ; ভৈক্ষ্যম্ ভিক্ষার দ্বারা; অপি ও; ইছ – এই জীবনে; লোকে –– এই জগতে; হজ্বা -হত্যা করে; অর্থ – লাভ; কামান্ কামনা করে; তু – কিন্তু; গুরুন গুরুজনদের; ইহ – এই জগতে; এব অবশ্যই; ভুঞ্জীয় -ভোগ করতে হবে; ভোগান্ – ভোগ্যবস্তু; রুধির – রক্ত; প্রদিগ্ধান্ -মাখা।

অনুবাদঃ মহানুভব গুরুজনদের বধ না করে ভিক্ষার অন্নে জিবন ধারণ করা ও ভাল। কিন্তু গুরুজনদের বধ করলে তাদের রক্তমাখা অর্থকামরূপ ভোগ বস্তু সমূহ ভোগ করতে হবে।

গীতার ২য় অধ্যায়

তাৎপর্যঃ শান্তনীতি অনুসারে, যে শুরু জঘন্য কার্যে লিপ্ত হয়েছে এবং ভাল মন্দ বিচারবোধ হারিয়ে ফেলেছে, তাকে পরিত্যাগ করা উচিত। দুর্যোধনের কাছ থেকে অর্থ সাহায্য পেতেন বলে ভীষ্ম ও দ্রোণ তার পক্ষ অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছিলেন, যদিও কেবলমাত্র আর্থিক সাহায্য পাবার ফলে দুর্যোধনের পক্ষে যোগ দেওয়া তাঁদের উচিত হয়নি।

এই অনুচিত কার্য করার ফলে, তাঁরা পাণ্ডবদের পরমারাধ্য শিক্ষাগুরুর পদের মর্যাদা থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদের প্রতি অর্জুনের শ্রদ্ধা কোন অংশে হ্রাস পায়নি এবং অর্জুন এই কথা ভেবে মনে মনে শিহরিত হয়েছেন যে, জাগতিক সুখ উপভোগ করার জন্য তাঁদের হত্যা করা হলে, সেই ভোগ হবে তাঁদের রুধিরমাখা।

শ্লোক ন চৈতদ্ বিস্মঃ কতরন্নো গরীয়ো যদ বা জয়েম যদি বা নো জয়েয়ুঃ।

যানের হতা ন জিজীবিষামস্ তেহবস্থিতাঃ প্রমুখে ধার্তরাষ্ট্ৰীঃ ৷৷ ৬ ৷৷

– না; চও; এতৎ এই; বিঘ্নঃ – আমরা জানি; কতরৎ যা নঃ – আমাদের; গরীয়ঃ — শ্রেয়ঃ; যত্ জয় করি; যদি যা; বা অথবা; জয়েম — যদি; বা অথবা; না আমাদের; জয়েঘু করা হয়; যান — যারা; এব জিজীবিষামঃ অবশ্যই; হজ্বা জীবন ধারণের ইচ্ছা করি; তে – অবস্থিত; প্রমুখে সম্মুখে; ধার্তরাষ্ট্রাঃ হত্যা করে; ন না; তারা সকলে; অবস্থিতাঃ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ।

অনুবাদঃ যদি আমরা এ যুদ্ধে জয়ী হই অথবা যদি এঁরা আমাদের পরাজিত করে জয়ী হয় তাহলে এ দুটির মধ্যে কোনটি শ্রেয় তা জানি না। এ ক্ষেত্রে জয় বা পরাজয়ের মধ্যে কোনটি মঙ্গলময় তা বুঝতে পারছি না। কারণ যাদের বধ করে আমি জীবনে বেঁচে থাকতে চাই না, সেই ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগণ আমার সামনে অবস্থিত রয়েছেন।

তাৎপর্যঃ যুদ্ধ করাটা যদিও ক্ষত্রিয়ের ধর্ম, তবুও অর্জুন স্থির করতে পারছিলেন না যে, সেই অনর্থক হিংসাত্মক যুদ্ধে রত হবেন, না কি ভিক্ষা বৃত্তি গ্রহণ করে জীবন ধারণ করবেন।

কৃষ্ণ নাম

আর তা ছাড়া, যুদ্ধে যে কোন পক্ষের জয় হবে, তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। যুদ্ধে পাণ্ডবদের জয় হলেও (কারণ, তাঁদের দাবি ছিল ন্যায়সঙ্গত) ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের অবর্তমানে জীবন ধারণ করা

এদিক দিয়ে বিচার করলে সেটিও তাদের পক্ষে এক রকম পরাজয়। অর্জুনের এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিবেচনা অবধারিতভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল মহৎ ডগবদ্ভক্তই ছিলেন না, তিনি গভীর তত্ত্বজ্ঞান সম্পন্ন পুরুষ ছিলেন এবং তিনি তাঁর মন ও ইন্দ্রিয়গুলিকে সর্বতোভাবে সংযত করেছিলেন।

আরো পড়ুন: একাদশী ব্রত মাহাত্ম্য

যদিও তিনি রাজকীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করে জীবন ধারণ করতে মনস্থ করেছিলেন। এর মাধ্যমেও আমরা দেখতে পাই যে, অন্তরে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অনাসক্ত। এই সমস্ত সদ্গুণাবলী এবং তাঁর গুরুদেব শ্রীকৃষ্ণের মুখপদ্ম-বাক্যের প্রতি তাঁর গভীর নিষ্ঠা, এই দুইয়ের সমন্বয়ের ফলে তিনি ছিলেন প্রকৃত ধার্মিক।

আমরা এখন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে, মুক্তি লাভের জন্য অর্জুন সম্পূর্ণরূপে যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন। ইন্দ্রিয় যদি সংযত না হয়, তবে দিব্যজ্ঞান উপলব্ধির স্তরে উন্নীত হওয়ার কোন সুযোগ থাকে না। এই দিব্যজ্ঞান ও ভক্তি ছাড়া জড় জগতের বন্ধন থেকে কোন রকমেই মুক্ত হওয়া যায় না। অর্জুন এই সমস্ত গুণাবলীর দ্বারা ভূষিত ছিলেন এবং সেই সঙ্গে ছিল জাগতিক সম্পর্কিত অস্বাভাবিক গুণাবলী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.